মোতা বিয়ে থেকে হালাল পতিতালয়

আবুল কালাম আজাদ 

অতি প্রাচীন আমল থেকে ভারত ভাগ হওয়ার আগে আফগানিস্তান, ইরান ও ইরাকের বর্ডারে লোক যাতায়াতের কোন বিধি নিষেধ ছিলনা। ফলে  আমাদের বাংলাদেশ  এলাকার লোক পায়ে হেটে আফগানিস্তান ইরান ও ইরাকের মধ্য দিয়ে সহজে মক্কায় গিয়ে হজ্জ করতো এবং  মদিনায় গিয়ে  রসুল( সাঃ) রওজামুবারক জিয়ারত করতেন। তখনকার দিনে হজ্জ যাত্রীরা পায়ে হেটে দল বেধে হজ্জ পালন করতে যেত। ঐ সময়ে মক্কার কাবায় হজ্জ ও মদিনায় রাসুল ( সাঃ) এর রওজামুবারক জিয়ারতের জন্য যাতায়াত করতে  সময় লাগত প্রায় ছয় মাস। হজ্জে যাত্রাকারীদের মধ্যে কেউ কেউ পথে অথবা মক্কা মদিনায় অসুস্থ হয়ে মৃত্যু বরন করত। আবার দলের  কিছু লোক সেখান  থেকে  ফিরে আসতোনা। যারা ফিরে আসতোনা তাদের সম্পর্কে দলের অন্যান্য সদস্যরা সমাজে প্রচার করতো তারা ওখানকার নারীকে মোতা বিয়ে করেছে সেজন্য তারা ২/৪  বছর পর ফিরে আসবে। ঐ ভাবেই মোতা বিয়ের ধারণা আমার মনোজগতে স্থান পায়। 

আসলে মোতা বিয়া হলো একজন পুরুষ একজন নারীকে টাকার বিনিময়ে স্বল্প সময় থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সহবাসের সঙ্গীনি হিসাবে চুক্তি করে নেওয়া। এক্ষেত্রে যে নারী তার স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্য  সহবাস করে সে পতিতা হিসাবেই পরিচিত। ইসলামী পরিভাষায় শিয়া নারী ও পুরুষদের স্বল্প সময়ের জন্য ধর্মীয় ও সামাজিক প্রথার বিয়ের নামই মোতা বিবাহ। লক্ষনীয় যে মোতা বিবাহ শুধু শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কিন্তু বাস্তবে যে শিয়া নারী পুরুষ খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকে তার কাছে শিয়া, সুন্নি কাদিয়ানী, ইহুদী, বৌদ্ধ, খৃষ্ঠান বা অন্য যে কোন জাতি ধর্মের লোক হিসাবে বিচার করার প্রয়োজন থাকে না। কেননা জাতি গোষ্টী কিংবা ধর্ম কারো গায়ে লেখা থাকেনা।  সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে মোতা বিবাহ নিষিদ্ধ। তবে তারা একসাথে  চার স্ত্রীর বেশী রাখতে পারেনা। বাস্তবে দেখা যায়, ঘরে তার এক থেকে চার স্ত্রী বৈধভাবে আছে তা সত্বেও ঘরের বাইরে অনেক বিশ্বস্থ সঙ্গীনি ছাড়াও পরকিয়ায় মত্ত আছে। আগেকার দিনে মোতা বিবাহে কোন কাজী বা স্বাক্ষীর প্রয়োজন হতোনা। এ বিয়েতে কোন তালাকের ব্যবস্থা নাই। 

কিভাবে মুসলিম প্রধান কিছু কিছু দেশে মোতা বিয়া থেকে হালাল পতিতালয় হলো এখানে তা উল্যেখ করতে চাই। প্রথমেই সবচেয়ে বেশী শিয়া মুসলিম বসবাস করা দেশ ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর সেখানকার কিছু নারীবাদী নেত্রী তাদের পতিতালয়ের মোতা বিয়ের পুরাতন পদ্ধতির আধুনিকায়ন করে, যাতে পতিতালয়ের একজন নারীকে সঙ্গীনি হিসাবে পেতে পুরুষ মানুষটি অতি সহজ পদ্ধতিতে কলেমা পড়ে বিয়ে করতে পারে এবং  বিয়ে করার স্থানটির নাম হালাল পতিতালয়। ২০১৩ সালে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান সরকার সে দেশে মোতা বিবাহের স্থানকে হালাল পতিতালয় নামকরণে অনুমতি দেয়।

যেরকম আমাদের দেশের বড় বড় শহরে মুরগীর বাজার থেকে মুরগী কিনতে গেলে দোকানের মালিকের কিছু কমবয়সী কর্মচারী দ্রুততার সাথে মুরগীর গলা কেটে ড্রামের মধ্যে ঢুকায়। আমি যে সমস্ত বাজার থেকে মুরগী নেই তারা মুরগী জবাই করতে আল্লাহ আকবর কখন বলে তা কেউ টেরই পায়না। অন্যদিকে ইউরোপ আমেরিকার স্বয়ংক্রিয় মেশিনের কসাইখানা গুলোতে হালাল মাংসের জন্য শক্ত হাতুড়ী দিয়ে গরুর মাথায় আঘাত করা হয়। আঘাত করার সময় এবং ভেড়া, ছাগলের ও মোরগ-মুরগির মেশিনে গলা কাটার সময় আল্লাহ আকবর বলে আলাদা আলাদা ভাবে রেকর্ড বাজানো হয়। হালাল পতিতালয়ে বিয়ে হলো বাজারে মুরগীর গলা কাটা অথবা ইউরোপ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার  মেসিনের কসাই খানায় আল্লাহ আকবর  শব্দের রেকর্ডের কার্যক্রমের সমান্তরাল। 

অর্থের বিনিময়ে যৌনতা বিক্রির ইতিহাস অতিপ্রাচীন। ইতিহাসের মতে প্রথম পতিতাবৃত্তি শুরু হয়েছিল ব্যবলীনায়দের দ্বারা। গণিকাবৃত্তি হচ্ছে এক ধরনের সামাজিক রীতি যেখানে একজন পুরুষ নিজ পত্নী ব্যতীত অন্য কোন নির্দিষ্ট স্থানের নারীর সাথে যৌনতায় মিলিত হয় তাকেই বলা হয় পতিতালয় এবং সেখানকার বাসিন্দাদের বলা হয় পতিতা, গনিকা, দেবদাসী, নটী বা বেশ্যা।  গণিকাবৃত্তি প্রাচীন প্রাচ্য দেশে বেশি মাত্রায় শুরু  হয়। প্রাচীন মেসোপটেমিয়ানরা ধর্মীয়ভাব যৌনতার প্রতিটি সু্যোগই কাজে লাগাত।  ব্যাবলীয়ানদের সবচেয়ে খারাপ রীতি ছিল প্রত্যেক মহিলাকে আফ্রিদিতি মন্দিরে যেতে হতো এবং সেখানে একজন অপরিচিত ব্যক্তির সাথে যৌন কর্মে লিপ্ত হতে হত। যেসব মহিলারা ধনী ও ব্যক্তিত্ব সচেতন ছিলেন তাদেরকে জোর করে অপরিচিত লোকের সাথে যৌন কর্মে যেতে হতো। মিলন শেষে পুরুষটি মহিলাকে টাকা দিতে বাধ্য থাকতো। 

দেবদাসী প্রথার চর্চা ভারতে বেশি এবং অনেক পুরোনো। যেখানে গ্রাম থেকে ছোট মেয়েদের ধরে এনে অথবা বাবা - মার মানত অনুযায়ী মেয়েকে ধর্মীয় প্রথা অনুযায়ী  দেবতার সাথে বা মন্দিরের সাথে বিয়ে দেওয়া হত এবং মেয়েকে  সেখানকার আস্তানাতে থাকতে হত।  উচ্চস্তরের বিত্তশালী হিন্দুরা দেবদাসীদের সাথে জোর করে  যৌন কর্ম করত । ভারতের বিভিন্ন রাজ্য সরকার আইন করে দেবদাসী প্রথা নিষিদ্ধ করেছে। এসব আইনের মধ্যে বোম্বে দেবদাসী আইন ১৯৩৪, দেবদাসী মাদ্রাজ আইন ১৯৪৭, কর্ণাটক দেবদাসী আইন ১৯৮২, অন্ধ্রপ্রদেশ দেবদাসী আইন ১৯৮৮ অন্যতম।তবে  সীমিত সংখ্যায় ভারতের  কোন কোন মন্দিরে এখনও দেবদাসী ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। 

হালাল ও হারাম শব্দ দুটি আরবী ভাষা থেকে সংগৃহীত। শব্দ দুটি ধর্মীয়ভাবে মানুষের খাদ্যগ্রহনের ক্ষেত্রে এবং জীবিকার প্রয়োজনে অর্থ ও সম্পদ আহরনের জন্য যে অবৈধ পন্থাগুলি অবলম্বন করে সেই পন্থাগুলোর মধ্যেই কিছু কিছু বিষয় যেমন সুদ, ঘুষ, দূর্নীতি ও যে অবৈধ কর্মের মাধ্যমে হয়ে থাকে সেটাই হলো হারাম।নিজের  স্ত্রী  সব সময়ে  হালাল এবং পতিতালয় নারীরা সব সময়েই নিষিদ্ধ বা হারাম। 

বয়ঃসন্ধি কালের পরেই প্রত্যেক পুরুষ ও নারীর জীবন যৌবন ও যৌনতা সাথে করে নিয়েই চলে। যৌনতা মানুষের খাদ্যের মতো প্রয়োজনীয় না হলেও খাদ্যের পরে অতি আকাঙ্খিত শারীরিক ও মানসিক চাহিদা। এই চাহিদা পূরনে সমাজে বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, পরকীয়া, জোর পূর্বক ধর্ষন, নারী অপহরন ইত্যাদি ঘটনা  ঘটে থাকে। সমাজ জীবনে এর বিরুপ প্রভাব নিয়ন্ত্রনে সৃষ্টি করা হয় পতিতালয়। কারন সমাজপতিরা এই ব্যবস্থাটিকে নিরাপদ মনে করেন। 

প্রত্যেক মানুষ একটা নিদ্দিষ্ট বয়সের পরেই যৌন সঙ্গীর প্রয়োজন অনুভব করে। আসলে মনে মনে প্রয়োজন অনুভব করলেও পুরুষতান্ত্রিক সমাজে স্ত্রীকে এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজে স্বামীকে  তাদের যৌনতার ফসল ও বংশধর  ছেলে   মেয়েদের লালন পালন করার দায়িত্ব অনেকেই সহজে গ্রহন করতে পারেনা বলে,তারা যৌনালয়ে বা পতিতালয়ে যায়। পতিতাবৃত্তি মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে চলে এসেছে।  পতিতালয় সমাজে প্রচলিত হাট বাজারের মতো আলাদা একটি স্থান। বহুগামীতা অনেক পুরুষের মধ্যেই বিদ্যমান এবং পুরুষের সুযোগও বেশী। নারীদের মধ্যে সংখ্যায় কম হলেও বহুগামীতা তাদের মধ্যেও বিদ্যমান। তবে পতিতাদের মধ্যে বেশির ভাগ মেয়ে পুরুষ চক্রের কারসাজিতে পতিতা বৃত্তিতে বাধ্য হয় আর কিছু আসে পতিতাদের গর্ভে জন্ম নেওয়া মেয়েদের মধ্য থেকে। 

বর্তমানে পৃথিবীর সবদেশেই আধুনিক ভাবে যৌনকর্মী নামে পতিতাবৃত্তি চলে।  আধুনিক পতিতালয় দুই প্রকারের। এক প্রকারের পতিতারা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করে যা আমাদের দেশেও এক সময়ে প্রতিটি শহর, বন্দর, হাটে-ঘাটে এমনকি তুলশীঘাট বাজারে নটী বা বেশ্যা নামে বিদ্যমান ছিল। ঐ সময়ে কম পয়সায় বেশ্যালয়ের  নটীদের যৌন সঙ্গী পাওয়া যেত বলে সমাজে ধর্ষন ও বলৎকারের ঘটনাগুলি কম সংগঠিত হতো। তবে সেগুলো ধর্মান্ধ লোক ও পতিতালয়ের আধিপত্য বিস্তারে যুক্ত লোকেদের লড়াইয়ে দেশের দৌলতদিয়া, মংলা, এবং নাটোরসহ দেশের কয়েকটি স্থানে বিভিন্ন ধরনের চাপের মধ্যেও তাদের  পেশা টিকে আছে।তবে দেশের বিভিন্ন স্থানের পতিতালয়গুলোর বেশির ভাগ বন্ধ হয়েছে বটে তবে শহর ও গ্রামে বিপুল সংখ্যক যৌন কর্মী সৃষ্টি হয়েছে।  মানুষের জীবনে যৌনতার কর্মকান্ড  বাস্তব ও দৃশ্যমান। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশাল আকারের আধুনিক পতিতালয় দেশের ও বিদেশের যৌন কর্মী  দ্বারা গড়ে উঠেছে। সেগুলির অনেক গুলো নির্দ্দিষ্ট এলাকায় বহুতল ভবনের বহু কক্ষে এবং বিভিন্ন উচু বা নিচু মানের হোটেলগুলিতে যৌনকর্মীরা নির্দ্দিষ্ট সময়ের জন্য এসে কাজ শেষে তাদের নিজ নিজ ঠিকানায় চলে যায়। অনেক যৌনকর্মী ঘরে  নামে মাত্র স্বামী রেখে এই কর্মের আয় দ্বারা নিজের পারিবারিক জীবন ও জীবিকা পরিচালনা করে এবং নিজের বহুগামিতার স্বস্তি মেটায়। আমাদের দেশের পতিতালয়ের যৌন কর্মীসহ পৃথিবীর সকলদেশের যৌন কর্মীদের ট্যাক্স প্রদান করতে হয় ফলে সরকারের ফান্ডের টাকার মধ্যে যৌনকর্মীদের দেওয়া ট্যাক্সের অংশও  থাকে। সরকার কোষাগারের সরকারি টাকা শিক্ষা স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে খরচ করে। 

পৃথিবীতে মুসলিম রাষ্ট্র গুলোর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় সর্ববৃহৎ পতিতালয় রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার সরকার তাদের এই দূর্নাম ঘোচানোর জন্য সেদেশেও হালাল পতিতালয় তৈরি করেছে। একইভাবে দুবাইতে পতিতাবৃত্তি বৈধ না হলেও অবাধে সমস্ত হোটেলে এবং বিভিন্ন পার্লারে খোলামেলাভাবে দেহ বিক্রি চলে। দীর্ঘ দিন ধরে সৌদি আরবের বহুগামী লোকেরা তাদের যৌনতার জন্য বাহরাইন এবং দুবাইয়ে যেত। যেহেতু সৌদি আরব শিয়া এবং সুন্নি মতাবলম্বী লোকের বসবাস তাই সেখানকার সরকার বহুগামী লোকদের কথা চিন্তা করে গত বছর থেকে হালাল পতিতালয় পরিচালনার অনুমতি দেয়। 

আমাদের এই উপমহাদেশে নারী ও পুরুষের মধ্যে বিবাহের পূর্বে তাদের যৌন ক্ষমতা নির্নয়ের কোন সামাজিক পদ্ধতি নাই। ফলে বিবাহের পর দেখা যায় অনেক স্বামী নপুংসক তাই তার স্ত্রীর দেহের ক্ষুধা মিটানোর জন্য অন্য পুরুষ লোক খুঁজতেই হয়। অপরদিকে বিবাহের পর স্ত্রীও দৈহিক মিলনে অনাগ্রহী ফলে স্বামীকে অন্য পন্থায় একজন নারীকে খুঁজতে হয়।

আধুনিককালে জীবন জীবিকা এবং ব্যবসা বানিজ্য যুদ্ধ বিগ্রহ, বিদ্যা অর্জন, ভ্রমন ইত্যাদি নানাবিধ কারনে নারী ও পুরুষের গৃহ ছেড়ে অন্যত্র বিভিন্ন শহর ও দেশে যাতায়াত ও অবস্থান ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবারের বাইরে অবস্থানগত কারনে স্বাভাবিক ভাবেই তার যৌন চাহিদা থাকার কারনে তাদের মধ্যে যৌনসাথীর প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বর্তমানে এগুলোর পরিবেশগত ও পেশাদারিক উন্নয়ন ঘটেছে। বিলাস বহুল হোটেল, রিসোর্ট, প্রমোদতরী ইত্যাদি সকল স্থানেই বিভিন্ন নামে পতিতাবৃত্তি এখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে চালু রয়েছে। 

শান্তি নগর, ঢাকা

১৩ মার্চ ২০২২ খৃষ্টাব্দ।

Post a Comment

Previous Post Next Post