প্রসংশা,সমালোচনা এবং তেলবাজি !!!

সিরাজুল ইসলাম সিরাজ

মানুষ জীবনে যতটা আলোচিত বা প্রসংশিত হয়,তার চেয়ে অনেক বেশী সমালোচিত হয়। 

মানুষ সব সময়ই অন্যের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত হয়,কখনোই অন্যের সাফল্যকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারে না। 

সমাজে আপনার কোন শত্রু নাই কিন্তু কোন কাজে আপনি সফলতা পেলেই দেখবেন আপনার শত্রুর অভাব নাই। 

মানুষ স্বভাবতই প্রশংসা প্রিয়।আমরা প্রসংশা পেতে সকলেই পছন্দ করি। প্রসংশা এবং অতিরঞ্জিত প্রসংশা বা তেলবাজি এক নয়। 

আমরা প্রসংশা পাগল হলেও গঠনমূলক সমালোচনা পছন্দ করি না। কিন্তু সত্য বা গঠনমূলক সমালোচনা এবং হিংসাত্মক নিন্দা এক নয়। 

 সমালোচনা গঠনমূলক হলেও তা মেনে নেওয়ার মতো উদারতা অনেকেরই নেই। 

আমাদের সমাজে দুই ধরনের মানুষই আছেন। এক ধরনের মানুষ তিলকে তাল বানিয়ে সমালোচনা করতে পছন্দ করেন। এদের বিপরিতে আছেন যারা  সব সময় প্রশংসার ফুলঝুড়ি নিয়ে ঘোরেন।এরা তেলবাজ, এরা তেল দিতে ভালোবাসেন। 

সব কিছুতেই বাড়িয়ে বলা কিংবা করা আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য। 

যাদের স্বভাবই সমালোচনা করা, খুঁত ধরা ,তারা সব কিছুতে সন্দেহ-সংশয় ব্যক্ত করেন। একদম নির্দোষ জিনিসের মধ্যেও খুঁত বের করে। নিন্দা করে এবং নিন্দা না করলে যেন পেটের ভাত হজমই হবে না। 

সবকিছুর মধ্যে নেতিবাচক কিছু খুঁজে বের করাই তাদের স্বভাব। তারা আসলে নিন্দুক সমালোচক নয়।

কবি বলেছেন, 

নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো,

যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো।

কিন্তু বাস্তবে নিন্দুককে ভালোবাসা সহজ নয় এবং কেউ ভালবাসেও না। 

 কারণ এই নিন্দুকরা আমাদের জীবনের পথে অহেতুক সমালোচনা আর উপহাস করে মনকে বিষিয়ে তোলে। কাজ করলে ভুল হবেই। আর মানুষ মাত্রই ভুল করে। সেই ভুলের সুযোগ নেয় নিন্দুক। মানুষের ছোট-খাটো 

দোষ-ত্রুটিকে বড় করে দেখিয়ে কুৎসা রটনা করে 

ঠাট্টা-বিদ্রুপের হাসি হাসাই নিন্দুকের কাজ। 

তাই আমাদের দায়িত্বশীলরা নিন্দুকের কাছ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেন। কারণ তাদের সকলের পক্ষে মানসিক দৃঢ়তা দিয়ে নিন্দা-সমালোচনাকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয় না। 

পৃথিবীর সব দেশেই এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। 

সমালোচনার ভালোমন্দ দুটো দিকই আছে। 

সমালোচনা যেমন মানুষের ভুল শুধরে দেয় আবার অনেক সময় তা এমন পর্যায়ে চলে যায়, যা মানুষের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। 

অনেক সময় দেখা যায়, সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে চলে যায়। সমালোচনার ভাষা এমন থাকে, যা মোটেও যৌক্তিক নয়। আবার অনেক সময় কেউ কেউ শুধু কাউকে অপছন্দ করে এবং ব্যক্তিগত  অপছন্দের কারনে সবকিছুতেই অনৈতিক সমালোচনা করে ।সত্য-মিথ্যা কিংবা  ভালো-মন্দ কোনো কিছুই বিবেচনা করে না।

এই সমালোচনা অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্বেষমূলক হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত লাভ, স্বার্থ, পছন্দ-অপছন্দকে কেন্দ্র করে সমালোচনা বা নিন্দা করা হয়।

সমাজে অনেক মেধাবী ও গুণী মানুষ আছেন যারা শুধু অহেতুক  সমালোচনার ভয়ে নিজের নিরাপদ বলয়ের বাইরে বের হন না। 

তাঁরা মনে করেন ঝামেলা বাড়িয়ে কি হবে,ভালোই তো আছি। তাদের দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই।দোষ নিন্দুকের,দোষ আমাদের সমাজের। 

যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে  সমালোচনাও ক্ষিপ্র গতিতে ছড়িয়ে পড়ে  চারদিকে।

একজন মানুষের ক্ষতি করা অনেক সহজ কিন্তু  উপকার করা অনেক কঠিন। আমরা  চারদিকের নেতিবাচক জিনিসে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে, এখন আর  সহজে মানুষের  ভালকিছু বিশ্বাস করি না । 

কেউ যে বিনা কারণে ভালো হতে পারে, ভালো কিছু করতে পারে ,স্বার্থহীন হতে পারে এসব বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়,আমরা বিশ্বাস করতেও চাই না। 

সমালোচনা আমরা অবশ্যই করব, কিন্তু শুধু শুধু সমালোচনা করতে গিয়ে বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে আমরা কারো মহত ও আন্তরিক উদ্যোগকে যেন বাঁধা না দেই। 

সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা একজন ব্যক্তি ও একটি সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায়। নিত্যদিন তাকে সতর্ক ও সচেতন করে, ভারসাম্যপূর্ণ পথ অবলম্বন ও ন্যায়পরায়ণ হতে উদ্বুদ্ধ করে। 

তবে অর্থহীন সমালোচনা ও দোষচর্চা সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। 

কাউকে অহেতুক হেয় করা, কারো সম্মান নষ্ট করা বা নিজের দল ভারী করার মতো হীন উদ্দেশ্যে সমালোচনা বা নিন্দা করার অনুমতি কোন ধর্মেও নেই।

নিন্দুক বা সমালোচকের বিপরীতে সমানতালেই চলছে তেলবাজী। এরা সবকিছুতেই প্রসংশায় পঞ্চমুখ। 

তেলবাজদের কারণেই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা কাজের ও কথার খেই হারিয়ে ফেলেন। 

সমালোচনা যেমন মানুষকে আড়ষ্ট করে তেলবাজীও তেমনি ক্ষমতাসীন বা কাজ করা লোকটির কাজের গতিকে শ্লোথ করে। 

নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিটি সমাজ, দেশ ও জাতিকে অনেক কিছু দিতে পারতেন , আরও অনেক ভাল কাজ করতে পারতেন, হয়তো সমাজের গরীব-অসহায় মানুষের পাশে আরও বেশী দাঁড়াতেন। 

কিন্তু তেলবাজরা বলেন

 “অনেক করেছেন আর কত ?

দেশ,জাতি ও সমাজের সকলেই আপনার নিকট চিরকৃতজ্ঞ, আপনি যা করলেন পৃথিবীতে এমনটা কেউ করে না।”

মাত্রারিক্ত তেলবাজরা ব্যক্তিগত স্বার্থে  তেলবাজী করতে গিয়ে প্রকারান্তরে সমাজ ও জাতিকে বঞ্চিত করলেন। 

এই তেলবাজরা  লাভবান হওয়ার আশায় এসব করলেও তেলের অন্য চরিত্র সম্পর্কে ভুলে যান। 

তারা মনেই করতে পারে না যে, উপরে উঠার জন্য 

তেল সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায়, সঠিক পদ্ধতিতে মাখতে হয়,তেমনি বেশি পিচ্ছিল করলে নিজেকেও পিছলে পড়তে হয়।

বেশী তেলিয়ে পিচ্ছিল করলে তেলও আপনাকে ক্ষমা করবে না। তেলের কাজই উপরে উঠানো এবং সুযোগ পেলে পিছলে ফেলে দেয়া। 

তেলবাজি যেমন একপ্রকারের কলা বা দক্ষতা, প্রশংসা করাও তেমনই। দুটোকেই ভালো করে শিখতে হয় এবং চর্চা করতে হয়। 

তেলবাজির ক্ষেত্রে নিজের বিবেক, বুদ্ধিমত্তা আর ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দিতে হয়। 

প্রশংসার ক্ষেত্রে শুধু নিজের অহংবোধ বা আমিত্বকে ত্যাগ করতে পারলেই হয়।

মনে রাখবেন মাত্রারিক্ত তেলবাজি হিংসাত্মক সমালোচনার চেয়েও ভয়ঙ্কর খারাপ পরিণতি  বয়ে 

আনে তেলবাজ এবং তেল গ্রহণকারীর জন্য।

পাদটিকাঃ একজন জনপ্রতিনিধি তাঁর নির্বাচনী এলাকার বিপদগ্রস্ত এক কর্মীকে গালমন্দ করে বলছেন,আমাকে তোমরা সংবর্ধনা দিলে না, খুব কষ্ট পেলাম। 

হায়রে জনপ্রতিনিধি বিপদগ্রস্ত কর্মীর কথা না শুনে শুধু নিজের প্রাপ্যতার কথাই বলছেন,মনে হল ভোট প্রাপ্তি তাঁর অধিকার এবং সংবর্ধনাই সন্মান দেখানোর একমাত্র হাতিয়ার।


Post a Comment

Previous Post Next Post